শনিবার ১১ জুলাই ২০২৬ - ১২:৫৬
শহীদ ইমামের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণে সবার দায়িত্ব / জাতিসংঘের জরাজীর্ণ কাঠামো ও স্থায়ী সদস্যদের অন্যায্য ভেটো ক্ষমতা শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে

আয়াতুল্লাহ কা’আবি বলেন: আমাদের সবার দায়িত্ব হলো এই বর্বর আগ্রাসী অপরাধীদের হত্যার ক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে অংশ নেওয়া-তা প্রস্তুতি গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে হোক, জনমত গঠন, গণমাধ্যমে আহ্বান, আর্থিক সহায়তা, রক্তের প্রতিশোধের দাবিতে প্রচারণা পরিচালনা অথবা প্রতিরোধ ফ্রন্টকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই হোক।

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, কোমের হাওজা শিক্ষক সমাজের সহ-সভাপতি এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য আয়াতুল্লাহ আব্বাস কা’আবি এক বার্তায় শহীদ ইমামের রক্তের প্রতিশোধের পতাকাবাহী হওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের দায়িত্ব সম্পর্কে ব্যাখ্যা করেছেন। নিচে তার বার্তার অনুবাদ দেওয়া হলো।

بسم الله الرحمن الرحیم

এখানে আলোচনা হচ্ছে শহীদ, মুজাহিদ ইমামের ঐতিহাসিক, আধ্যাত্মিক, সভ্যতাগত ও মানবিক জানাজার বার্তা এবং ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনের সূচনায় তার ভূমিকা নিয়ে।

তিনি তাঁর পূর্বপুরুষ ইমাম আলী (আ.)-এর মতোই শক্তিশালী হয়েও নিপীড়িত ছিলেন। সমসাময়িকতার সীমাবদ্ধতার কারণে আল্লাহর এই নেক বান্দা, আল্লাহ-পরিচিত আলেম ও আল্লাহর ওলির প্রকৃত মর্যাদা যথাযথভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি।

সম্ভবত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং আমাদের প্রভু ইমাম মাহদী (আ.)-এর আবির্ভাব পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বের গুরুত্ব-বিশেষ করে কুদস ও ফিলিস্তিনের মুক্তি, মানবজাতিকে কল্যাণময় জীবনের দিকে পরিচালিত করা, নতুন ইসলামী সভ্যতা প্রতিষ্ঠা এবং মাহদীয় রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণে তাঁর ভূমিকা-ক্রমে স্পষ্ট হবে।

তিনি ছিলেন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর উত্তরাধিকারী, আশুরার কাফেলার নেতা, ইমাম হুসাইনের সঙ্গীদের উত্তরসূরি এবং গায়েবতের যুগে ইমাম মাহদী (আ.)-এর সহযোগী।

তেহরান, কোম, নাজাফ, কারবালা ও মাশহাদে কয়েক কোটি মানুষের উপস্থিতিতে বিদায়, জানাজা ও দাফনের অনুষ্ঠান বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়েছে। এই জনসমুদ্র রক্তের প্রতিশোধের পতাকা ধারণ করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে গণজাগরণের সূচনা করেছে এবং আত্মগঠন, সমাজগঠন ও সভ্যতা নির্মাণের এক নতুন পথের সূচনা করেছে। লেখকের মতে, এই পথ ‘দ্বিতীয় পদক্ষেপের ঘোষণাপত্র" এবং "অগ্রণী ও আদর্শ হাওযা’-এই দুটি মৌলিক নীতিপত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, যার বাস্তবায়নের দায়িত্ব জাতি ও বিশেষ করে হাওযা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত প্রজন্মের ওপর বর্তায়।

তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের জরাজীর্ণ কাঠামো এবং স্থায়ী সদস্যদের অন্যায্য ভেটো ব্যবস্থা এখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কাঠামোগত পরিবর্তন এবং নতুন ধরনের জোট গঠনের মাধ্যমে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা সৃষ্টি হবে, যেখানে প্রতিরোধ-অক্ষ অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

তিনি দাবি করেন, ইমাম খোমেনীর ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হবে এবং শহীদ ইমাম খামেনেয়ীর রক্তের প্রতিশোধকারীদের ‘সভ্যতাগত প্রতিরোধ’-এর মাধ্যমে ইসলাম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলো দখল করবে।

তিনি বলেন, নিঃসন্দেহে একবিংশ শতাব্দী হবে মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের নেতৃত্বের শতাব্দী।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ‘ইয়া লিসারাতিল খামেনেয়ী’ (খামেনেয়ীর রক্তের প্রতিশোধ) স্লোগানটি ‘ইয়া লিসারাতিল হুসাইন’ (হুসাইনের রক্তের প্রতিশোধ)-এর ধারাবাহিকতা এবং এই রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ প্রত্যেকের জন্য একটি ধর্মীয় ও সর্বজনীন কর্তব্য।

তিনি বলেন: আমাদের সকলের কর্তব্য হলো এই বর্বর আগ্রাসী অপরাধীদের হত্যার ক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে অংশ নেওয়া-প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ, উপকরণ সরবরাহ, দাবি উত্থাপন, গণমাধ্যমে আহ্বান, আর্থিক সহায়তা, প্রতিশোধের দাবিতে প্রচারণা, প্রতিরোধ ফ্রন্টকে শক্তিশালী করা, জিহাদি মনোভাব, আত্মত্যাগ ও শাহাদাতের চেতনা লালন করা এবং শহীদ ইমাম খামেনেয়ী, তাঁর সঙ্গী ও আদর্শের স্মৃতি জীবিত রাখার মাধ্যমে।

তবে তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প, নেতানিয়াহু বা অন্য অপরাধীদের হত্যা করলেই প্রতিশোধের কাজ শেষ হবে না; বরং কুদস ও ফিলিস্তিনের মুক্তি এবং তাওহিদ, ন্যায়বিচার ও মানবমর্যাদার ভিত্তিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত বৈশ্বিক ‘অত্যাচারী শক্তির’ বিরুদ্ধে জিহাদ ও প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেন, রক্তের প্রতিশোধ একটি চলমান প্রক্রিয়া, কোনো একক ঘটনা নয়, এবং এর জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে।

তিনি যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেন:

১. প্রতিরোধ অব্যাহত রাখা, জাতীয় শক্তি বৃদ্ধি করা এবং শত্রুর হুমকিকে সুযোগে পরিণত করা; সাংস্কৃতিক, শিল্প, গণমাধ্যম, অর্থনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কূটনীতি, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও সামরিকসহ সব ক্ষেত্রে।

২. সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতি ও সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি করা।

৩. জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ বজায় রাখা, বিপ্লবের আদর্শের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্নবীকরণ এবং সাইয়্যিদ মুজতবা খামেনেয়ী-এর নির্দেশনা বাস্তবায়নের দাবি অব্যাহত রাখা।

৪. অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য জিহাদি ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর জনমুখী শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।

৫. জাতীয় ঐক্য, জাতীয় নিরাপত্তা, জনগণের অংশগ্রহণ, প্রতিরোধভিত্তিক অর্থনীতি, সম্পদ সৃষ্টি, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সকল জাতীয় সক্ষমতার বিকাশ নিশ্চিত করা।

৬. ঈমান, ভ্রাতৃত্ব, সহযোগিতা, আত্মত্যাগ, তাকওয়া, ন্যায়বিচার, মানবমর্যাদা এবং ইরানি-ইসলামী পরিচয়ের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় করা।

শেষাংশে তিনি বলেন, শহীদ ইমামের জানাজার জন্য ‘উঠে দাঁড়াতে হবে’ এবং "আল্লাহর জন্য দাঁড়াও" (قوموا لله)-এই স্লোগান যথার্থভাবেই নির্বাচিত হয়েছিল।

তিনি উল্লেখ করেন, ইমাম খোমেনী আল্লাহর উদ্দেশ্যে সর্বজনীন গণআন্দোলনের আহ্বান দিয়ে ইসলামী বিপ্লব শুরু করেছিলেন এবং তা বিজয়ে পৌঁছে দেন। তাঁর মতে, ইমাম খামেনেয়ী প্রায় চার দশক ধরে সেই আশুরাবাদী আন্দোলনের পতাকা বহন করেছেন এবং ইরানকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিতে পরিণত করেছেন।

তিনি উপসংহারে বলেন, এই অভূতপূর্ব জানাজায় জনগণ ও প্রতিরোধ ফ্রন্ট প্রমাণ করেছে যে তারা শহীদ ইমাম খামেনেয়ীর পথ তাঁর উত্তরসূরি সাইয়্যিদ মুজতবা খামেনেয়ী-এর নেতৃত্বে অনুসরণ করবে এবং মানবজাতির ত্রাণকর্তার আবির্ভাব পর্যন্ত শহীদ ইমামের রক্তের প্রতিশোধের পতাকা নামিয়ে রাখবে না।

শেষে তিনি কুরআনের দুটি আয়াত উদ্ধৃত করেন: ‘তারা একে অনেক দূরের বিষয় মনে করে, আর আমরা একে খুব নিকটবর্তী দেখি।‘এবং ‘বিজয় তো কেবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।‘

আব্বাস কাবি
১৯/৪/১৪০৫ (ইরানি সৌর হিজরি তারিখ)

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha